১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
preview
ভেতরে নারী বাইরে নারী, মাঝখানে ‘ওসি’ মাহবুব

মো. নূর নবী শেখ

রাজশাহীতে একটি ফ্ল্যাটের ভেতর অবস্থান করছিলেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা ও এক নারী। খবর পেয়ে ওই কর্মকর্তার স্ত্রী পরিচয়ে সাতসকালেই নওগাঁ থেকে ছুটে আসেন আরেক নারী। তারপর দুই ঘণ্টা ধরে দরজায় কড়া নাড়লেও ভেতর থেকে কেউ বের হননি। পরে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে দুজনকে থানায় নিয়ে যান।

শুক্রবার সকালে নগরীর চন্দ্রিমা থানার নাদের হাজির মোড়সংলগ্ন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ফ্ল্যাট থেকে থানায় নেওয়া পুলিশ কর্মকর্তার নাম মাহবুব আলম। তিনি ২০২৪ সালে চন্দ্রিমা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ছিলেন। ওই সময় এক ব্যক্তির কাছ থেকে খাম নেওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তাঁকে প্রত্যাহার করা হয়।

পরে মাহবুব আলম নওগাঁ জেলা পুলিশে কর্মরত ছিলেন। সেখানে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। এরপর তাঁকে সিরাজগঞ্জ ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারে সংযুক্ত করা হয়। সেখান থেকে ছুটি বা অনুমতি না নিয়েই তিনি রাজশাহীতে এসেছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

মাহবুব আলমের একজন পালিত মেয়ে রয়েছেন। ওই মেয়ে ও তাঁর স্বামী নাদের হাজির মোড়ের একটি ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকেন। তবে বৃহস্পতিবার রাত থেকে ফ্ল্যাটটিতে মাহবুব আলম ও সানজিদা মৌ নামের এক নারী অবস্থান করছিলেন।

সানজিদা মৌ মাহবুব আলমকে নিজের স্বামী বলে দাবি করেছেন। তবে এ দাবির পক্ষে তিনি কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। অন্যদিকে ফ্ল্যাটের বাইরে অবস্থান নেওয়া আন্নি আক্তার নিজেকে মাহবুব আলমের ষষ্ঠ স্ত্রী বলে দাবি করেন। তবে মাহবুব আলমের দাবি, চার দিন আগে তিনি আন্নিকে তালাক দিয়েছেন।

আন্নি আক্তারের বাড়ি নওগাঁ। তিনি নারী উদ্যোক্তা ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর। শুক্রবার চন্দ্রিমা থানায় সাংবাদিকদের কাছে তিনি অভিযোগ করেন, মাহবুব আলম যে জেলায় যান, সেখানেই বিয়ে করেন। এ ছাড়া একাধিক নারীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

আন্নি বলেন, চলতি বছরের শুরুতে মাহবুব আলম তাঁকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর তিনি তাঁর সম্পর্কে বিভিন্ন বিষয় জানতে পারেন। রাজশাহী নগরের পদ্মা আবাসিক এলাকায় মাহবুব আলমের একটি নিজস্ব ফ্ল্যাট রয়েছে। এর আগে ওই ফ্ল্যাটে সানজিদা মৌয়ের সঙ্গে তাঁকে দুই দিন পেয়েছিলেন। তখন মান-সম্মানের কথা ভেবে বিষয়টি নিয়ে কিছু বলেননি।

আন্নি জানান, গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে খবর পান মাহবুব আলম তাঁর পালিত মেয়ের ভাড়া নেওয়া ফ্ল্যাটে এসেছেন এবং সেখানে সানজিদা মৌও রয়েছেন। শুক্রবার সকাল সাড়ে ৭টার মধ্যে তিনি সেখানে গিয়ে দরজায় ডাকাডাকি করেন। দরজা না খোলায় ৯৯৯ নম্বরে ফোন করেন। পরে চন্দ্রিমা থানা থেকে পুলিশ এলেও ভেতরে মাহবুব আলম অবস্থান করছেন জানতে পেরে দরজা ভাঙেনি বলে অভিযোগ করেন তিনি। এরপর তিনি ফায়ার সার্ভিসে খবর দেন।

পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা এসে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকেন।

আন্নি বলেন, এর মধ্যে দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে মাহবুব আলম ও সানজিদা মৌ ভেতর থেকে ছিটকিনি লাগিয়ে ছিলেন। পুলিশ ফোন করে দরজা খুলতে বললেও তিনি খোলেননি। দরজা ভাঙার পর মাহবুব আলম সানজিদাকে তাঁর স্ত্রী বলে দাবি করেন।

মাহবুব আলম ও সানজিদা মৌকে পুলিশ থানায় নিয়ে যাওয়ার সময় সাংবাদিকেরা তাঁদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন। সানজিদা কোনো কথা বলেননি। মাহবুব আলম বলেন, আন্নি আক্তারকে তিনি তালাক দিয়েছেন এবং সানজিদা তাঁর স্ত্রী। তিনি পুলিশের কাছে আন্নিকে তালাক দেওয়ার কাগজ দিয়েছেন বলেও জানান। তবে তিনি সানজিদার সঙ্গে বিয়ের কাবিননামা দেখাতে পারেননি।

পুলিশ জানিয়েছে, চার দিন আগে আন্নি আক্তারকে তালাক দেওয়ার একটি কাগজ মাহবুব আলম দিয়েছেন। তবে আন্নি জানিয়েছেন, তিনি তালাকের কোনো কাগজ পাননি।

এ ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছেন আন্নি আক্তার। শুক্রবার দুপুরে অভিযোগ লেখার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এ সময় সানজিদা মৌ ও মাহবুব আলমকে থানার আলাদা দুটি কক্ষে রাখা হয়। আন্নি ওই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

চন্দ্রিমা থানার ওসি মনিরুল ইসলাম ছুটিতে থাকায় শুক্রবার দুপুরে থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মাহমুদ সিদ্দিকী বলেন, ‘মাহবুব আলম ও সানজিদা মৌয়ের ব্যাপারে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা থানায় আসবেন। এরপর সিদ্ধান্ত হবে।’

সিরাজগঞ্জ ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারের কমান্ড্যান্ট মোস্তাক আহমেদ বলেন, ‘কিছুক্ষণ আগে আমি ঘটনাটি শুনেছি। মাহবুব আলমের কোনো ছুটি নেই। তিনি কাউকে জানিয়েও রাজশাহী যাননি। বিনা অনুমতিতে কর্মস্থল ত্যাগ করাও একটি অপরাধ।’

তিনি আরও বলেন, মাহবুব আলম ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারে সংযুক্ত থাকলেও নওগাঁ জেলা পুলিশে কর্মরত। বিষয়টি নওগাঁ জেলা পুলিশকে জানানো হয়েছে। তারা এ বিষয়ে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেবে।


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মনিরা রওনক বুবলি

ই-মেইল: kolom24news@gmail.com