১২ অক্টোবর ২০২৬
preview
মামলা-গ্রেপ্তারের আতঙ্কে কটিয়াদীর তিন গ্রামে পুরুষ নেই

মো. নূর নবী শেখ

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে পুলিশের কাজে বাধা ও গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনায় একটি মামলায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তারের পর তিনটি গ্রামে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। গ্রেপ্তারের ভয়ে এসব গ্রামের পুরুষেরা চারদিন ধরে রাতে বাড়িতে ঘুমান না। আতঙ্কে নারী-শিশুরাও গ্রাম ছাড়ছেন।

কটিয়াদী পৌর এলাকার বেথইর, মুমুরদিয়া ইউনিয়নের পিপুলিয়া ও লাংটিয়া গ্রামে রাত নামলেই নীরবতা নেমে আসছে। গত রোববার রাতে বেথইর গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, অধিকাংশ বাড়ির বসতঘরের দরজা-জানালা বন্ধ। কিছু বাড়িতে তালা ঝুলছে। দু-একটি বাড়িতে নারী ও শিশুদের দেখা যায়। তবে আতঙ্কে অনেকেই কথা বলতে রাজি হননি। এর আগে গত শুক্রবার কয়েকটি বাড়িতে গিয়ে পুরুষ সদস্যদের পাওয়া যায়নি। সব মিলিয়ে তিনটি গ্রামের অন্তত শতাধিক বাড়িতে পুরুষ সদস্যরা গ্রেপ্তারের আতঙ্কে আছেন বলে জানা গেছে।

অপহরণচেষ্টা থেকে শুরু
তিন গ্রামের বাসিন্দা ও পুলিশের দেওয়া তথ্যমতে, গত ৭ অক্টোবর কটিয়াদী পৌরসভার বেথইর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ইলমা আক্তারকে অটোরিকশায় তুলে অপহরণচেষ্টার অভিযোগ ওঠে প্রিয়া আক্তার (২৪) নামের এক নারীর বিরুদ্ধে। স্থানীয় লোকজন তাঁকে আটক করে বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে বন্দী রাখেন। খবর পেয়ে কটিয়াদী মডেল থানার পুলিশ সেখানে যায়। প্রিয়া আক্তারকে পিকআপ ভ্যানে তুলে থানায় নেওয়ার সময় বাধা দেয় উত্তেজিত জনতা। এ সময় দুই পক্ষের সংঘর্ষ হয়। আহত হন পুলিশের চার সদস্য। পুলিশের একটি পিকআপ ভ্যানও ভাঙচুর করে জনতা।

এ বিষয়ে থানায় মামলা হলে পরদিন পুলিশ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে। তারা হলেন– কটিয়াদী পৌর মহিলা বিএম কলেজের প্রভাষক মো. ছোটন মিয়া (৩২), মুমুরদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. সামসুদ্দিন (৩৫), কটিয়াদী সরকারি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী এনামুল হক ইস্তি (১৯), বেথইর রইছ মাহমুদ উচ্চবিদ্যালয়ের পরিচ্ছন্ন কর্মী মো. বাইজিদ ইসলাম (২৬) ও বেথইর গ্রামের নজরুল ইসলামের স্ত্রী জুঁই আক্তার (২৮)।

জুঁই আক্তারের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, জুঁই কী ঘটেছে, তা দেখতে ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন। কিন্তু ভিডিও ফুটেজে তাঁকে দেখা যাওয়ার কারণেই পুলিশ গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেছে। জুঁইয়ের চার সন্তানের মধ্যে একটির বয়স দেড় বছর। মাকে না পেয়ে সে কান্নাকাটি করছে। কোনোভাবেই তাকে থামানো যাচ্ছে না।

অন্য গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরাও একই মন্তব্য করেন। তাঁদের দাবি, ঘটনার সময় সেখানে উপস্থিত থাকা আর পুলিশের ওপর হামলায় অংশ নেওয়া এক বিষয় নয়। বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্ত ও নিরপরাধ ব্যক্তিদের হয়রানি না করার আহ্বান জানান তারা।

ঋতু আক্তার নামের এক নারী বলেন, গ্রামের নারী-শিশুরা আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। অজ্ঞাতপরিচয় আসামি হিসেবে পুলিশ যে কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারে। এ জন্য পুরুষেরা বাড়িছাড়া।

বেথইর রইছ মাহমুদ উচ্চ বিদ্যালয়ের পরিচ্ছন্ন কর্মী বাইজিদ ইসলামের স্বজনেরা জানিয়েছেন, অপহরণচেষ্টার ঘটনায় সন্দেহভাজন নারীকে বাইজিদ রাস্তা থেকে ধরে বিদ্যালয়ে নিয়ে এসেছিলেন। পুলিশের কাছে তুলে দেওয়ার আগপর্যন্ত নিজ হেফাজতে রেখেছিলেন। অথচ তাঁকেই পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।

রফিকুল ইসলাম বিপুল নামের এক ব্যক্তি বলেন, ‘আমি সামাজিক কাজ করি। ভিডিও করি, অসহায় মানুষের চিত্র তুলে ধরি। মানুষ তাদের আর্থিক সহযোগিতা করেন। এতে অনেকের উপকার হয়।’ তিনি আগামী নির্বাচনে চেয়ারম্যান হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চান বলে একটি গোষ্ঠী ষড়যন্ত্রমূলকভাবে তাঁকেও এই মামলা আসামি করেছে বলে অভিযোগ করেন। রফিকুল ইসলামের ভাষ্য, ঘটনার সময় তিনি ভিডিও করছিলেন।

মামলাটির তদন্ত করছেন কটিয়াদী মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. সাদরুজ্জামান। তিনি বলেন, মামলায় সরকারি কাজে বাধা দেওয়া, পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর এবং কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার অভিযোগ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে বৃহস্পতিবার আদালেত পাঠিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, ‘যাচাই-বাছাই করেই প্রকৃত অপরাধী গ্রেপ্তার করা হয়। ভয়ে অন্যরা কেন পালিয়েছেন, তা আমার বোধগম্য নয়।’

নিরীহ মানুষকে হয়রানির অভিযোগ অস্বীকার করে থানার ওসি রফিকুল ইসলাম বলেন, এ ঘটনায় ১৩ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতপরিচয় ৩০-৪০ জনকে আসামি করে মামলা করেন এসআই মাসুদুর রহমান। ইতোমধ্যে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। তবে কোনো সাধারণ মানুষকে গ্রেপ্তার করা হবে না। এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মনিরা রওনক বুবলি

ই-মেইল: kolom24news@gmail.com