মো. নূর নবী শেখ
সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের তিনটি ডেগ ও পাঁচটি দানবাক্সে পঞ্চম দফায় গণনায় পাওয়া গেছে ৮৮ লাখ ৬৫ হাজার ৮০৪ টাকা। নগদ অর্থের পাশাপাশি মিলেছে স্বর্ণ, রুপা ও বিভিন্ন দেশের বৈদেশিক মুদ্রা। তবে দানবাক্স ও মানতের ডেগে জমা পড়া চিঠিগুলোও ছিল আলোচনায়। এক চিঠিতে শেখ হাসিনার সুস্থতা কামনা করে তাকে ‘বাংলাদেশের মানুষের আশার আলো’ হয়ে ফিরে আসার প্রার্থনা করা হয়েছে। আরেক চিঠিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে উদ্দেশ করে বিএনপির সদস্য ও কর্মী হওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া এক নারী স্বামীর ভালো চাকরি ও মানসিক শান্তি চেয়ে প্রার্থনা করেছেন।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৯টা থেকে শুরু হয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে দানবাক্স ও ডেগের অর্থ গণনা। সন্ধ্যায় গণনা শেষে প্রাপ্ত অর্থের পরিমাণ নিশ্চিত করেন সিলেটের জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মামুন।
মাজার কর্তৃপক্ষ জানায়, নগদ অর্থের পাশাপাশি পাওয়া গেছে ১ ভরি সাড়ে ৮ আনা স্বর্ণ ও ৩ ভরি ১৩ আনা রুপা। বিভিন্ন দেশের মুদ্রার মধ্যে রয়েছে ১৪ ব্রিটিশ পাউন্ড, ৭ হাজার ৬৪৭ ভারতীয় রুপি, ২০ থাই বাত, ৯৩ সৌদি রিয়াল ও পয়সা, ১১ মালয়েশীয় রিঙ্গিত, ২৯ মার্কিন ডলার, ১ হাজার ৩৫০ দশমিক ৫০ ওমানি বায়সা, ৬৫ সংযুক্ত আরব আমিরাতের দিরহাম, ১৫ মালদ্বীপের রুফিয়া এবং ১৭ কাতারি রিয়াল ও পয়সা।
এ ছাড়া পাওয়া গেছে ৭ ইউরো ৩৩ সেন্ট, ১০০ বাহরাইনি পয়সা, ১০ হংকং ডলার, ১ কুয়েতি ডলার, ৫৫ নেপালি রুপি, ১০০ পাকিস্তানি রুপি, ৫০ রুশ রুবল ও ৫০০ শ্রীলঙ্কান রুপি।
মানতের ডেগে পাওয়া একটি চিঠিতে শেখ হাসিনার সুস্থতা কামনা করে তাকে দেশে ফিরে আসার প্রার্থনা করা হয়েছে। চিঠিতে ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখ উল্লেখ করে শেখ হাসিনার ৮০তম জন্মদিন উপলক্ষে দোয়া করার কথা লেখা হয়েছে। লালবাগ থানা ২৪ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে মো. মামুন হোসেন মন্নার নাম উল্লেখ করে চিঠিটি লেখা হয়েছে।
চিঠিতে লেখা হয়েছে, ‘বঙ্গবন্ধুর কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনার ৮০তম জন্মদিন উপলক্ষে হযরত শাহজালাল মাজারে নেত্রীর জন্য দোয়া ও প্রার্থনা করছি। আল্লাহ পাক যেন তাকে সর্বদা সুস্থ রাখেন এবং বাংলাদেশের মানুষের আশার আলো হয়ে যেন ফিরে আসেন, আমিন।’
চিঠির শেষে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু, জয় হোক দেশরত্ন শেখ হাসিনার’ স্লোগানও লেখা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে উদ্দেশ করে লেখা আরেকটি চিঠিতে বিএনপির সদস্য ও কর্মী হওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
চিঠিতে বিএনপির সদস্য হতে ন্যূনতম এসএসসি পাস অথবা জিপিএ ২.৫ এবং কর্মী হতে এইচএসসি পাস ও জিপিএ ৩.৫ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার আগে কেউ যেন বিএনপির সঙ্গে যুক্ত হতে না পারেন, সে বিষয়েও আবেদন জানানো হয়েছে।
চিঠির লেখক জানিয়েছেন, ২০১১ সালে তিনি রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছিলেন। পরে রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি। নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ও দলের সংস্কার নিয়ে ব্যক্তিগত আকুতির পাশাপাশি চিঠির শেষে ইংরেজিতে লেখা রয়েছে, ‘I want the change to come through you.....’। তবে চিঠিতে প্রেরকের নাম উল্লেখ নেই।
দানবাক্স ও মানতের ডেগে পাওয়া আরেকটি চিঠিতে এক নারী স্বামীর ভালো চাকরি ও মানসিক শান্তি কামনা করেছেন। নামবিহীন ওই প্রার্থনাপত্রে লেখা হয়েছে, ‘হে শাহজালাল রহমাতুল্লাহি আলাইহি, আপনার উছিলায় আমার আহাল (স্বামী)-উনাকে একটা ভালো চাকরি দিন এবং উনার মানসিক শান্তি দান করুন।’
মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে গত ২৩ সেপ্টেম্বর গঠিত কমিটির সভায় প্রতিদিন দানের টাকা গণনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। সে অনুযায়ী, টাকা গণনা, হিসাব সংরক্ষণ ও ব্যয়ের জন্য একজন ব্যবস্থাপক, একজন হিসাবরক্ষক এবং একজন অফিস সহকারী নিয়োগ দেওয়ার কথা রয়েছে। তবে নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ না হওয়ায় এখনো প্রতিদিন টাকা গণনার ব্যবস্থা চালু করা যায়নি।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দানবাক্সের অর্থের ৩৫ শতাংশ মাজারের উন্নয়নকাজে ব্যয় করা হবে। এ অর্থ সোনালী ব্যাংকের একটি হিসাবে জমা রাখা হবে। বাকি ৬৫ শতাংশ দিয়ে মাজারের দৈনন্দিন খরচ ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দেওয়া হবে।
সকালে জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মামুন সাংবাদিকদের বলেন, এবারও দানবাক্সে পাওয়া টাকা ব্যাংক হিসাবে রাখা হবে। সেখান থেকে বিদ্যুৎ বিলসহ বিভিন্ন ইউটিলিটি বিল পরিশোধ এবং আনসার সদস্যদের বেতন দেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, আপাতত মাসে একবার দানের টাকা গণনা করা হবে। নিয়োগপ্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং এ জন্য সিভি জমা হয়েছে। আগামী মাসের মধ্যেই নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, কর্মী নিয়োগের পর প্রতিদিন দানের টাকা গণনা করা হবে। এর আগে বর্তমান ব্যবস্থাপনায় আরও একবার টাকা গণনা হতে পারে।
মাজার কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৩৫ দিনে সাতটি গরুর মধ্যে চারটি লঙ্গরখানায় শিরণি করা হয়েছে। বাকি তিনটি গরু খাদিমরা পেয়েছেন।
এ সময়ে ৩১০টি ছাগলের মধ্যে ২৫টি জবাই করে বিতরণ করা হয়েছে এবং ২১০টি ছাগল লঙ্গরখানায় খাওয়ানো হয়েছে। ২৭টি ছাগল ভক্তরা শিরণি করেছেন, আর ৪৮টি ছাগল খাদিমরা পেয়েছেন।
এর আগে গত ২২ জুন প্রথম দফায় গণনায় পাওয়া যায় ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা। পরে জেলা প্রশাসনের তহবিল থেকে ৫ লাখ টাকার চেক যুক্ত হলে মোট অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ২২ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা।
১১ জুলাই দ্বিতীয় দফায় পাওয়া যায় ৪৭ লাখ ১০ হাজার ১৫৩ টাকা। ১৫ আগস্ট তৃতীয় দফায় গণনায় পাওয়া যায় ৭০ লাখ ৮৮ হাজার ৬৭২ টাকা।
সর্বশেষ ১৯ সেপ্টেম্বর চতুর্থ দফায় দানবাক্স ও ডেগ থেকে পাওয়া যায় ৮৮ লাখ ৯২ হাজার ৯৬৬ টাকা। ওই দফাতেও নগদ অর্থের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের বৈদেশিক মুদ্রা, স্বর্ণ ও রুপা পাওয়া গিয়েছিল।
পঞ্চম দফায় পাওয়া ৮৮ লাখ ৬৫ হাজার ৮০৪ টাকা আগের দফার তুলনায় ২৭ হাজার ১৬২ টাকা কম।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মনিরা রওনক বুবলি
ই-মেইল: kolom24news@gmail.com