মো. নূর নবী শেখ
ইসলামে আল্লাহর রহমত ও ক্ষমার পরিধি ব্যাপক। মানুষ যত বড় পাপই করুক না কেন, জীবিত অবস্থায় আন্তরিকভাবে তওবা করে পাপ থেকে ফিরে এলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করতে পারেন। তবে কোরআন ও হাদিসে এমন কিছু সময় ও পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যখন তওবা বা ঈমান গ্রহণ আর গ্রহণযোগ্য হয় না। তাই সময় থাকতে পাপ থেকে ফিরে আসা এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া জরুরি।
কোরআন-হাদিসের আলোকে তওবা কবুল না হওয়ার কয়েকটি পরিস্থিতি তুলে ধরা হলো।
১. মৃত্যুযন্ত্রণা শুরু হলে
মানুষের মৃত্যু যখন আসন্ন হয়ে পড়ে এবং প্রাণ কণ্ঠনালিতে পৌঁছানোর উপক্রম হয়, তখন তার তওবা আর কবুল হয় না। কারণ, তখন পরকালের বাস্তবতা তার সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অথচ তওবা করতে হয় সেই অদৃশ্য জগতের বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করার আগেই।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘আর তাদের জন্য কোনো তওবা নেই, যারা আজীবন মন্দ কাজ করে, অবশেষে তাদের কারও মৃত্যু উপস্থিত হলে সে বলে, আমি এখন তওবা করছি।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ১৮)
এ বিষয়ে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ বান্দার তওবা কবুল করেন, যতক্ষণ না তার মৃত্যুযন্ত্রণা শুরু হয় বা প্রাণবায়ু কণ্ঠনালিতে পৌঁছে যায়।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৩৫৩৭)
এর উদাহরণ হিসেবে ফেরাউনের কথা উল্লেখ করা যায়। ডুবে যাওয়ার সময় মৃত্যু নিশ্চিত বুঝতে পেরে সে ঈমান আনার কথা বলেছিল। কিন্তু তখন তার সেই ঘোষণা গ্রহণ করা হয়নি।
২. পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উঠলে
কেয়ামতের অন্যতম বড় নিদর্শন হলো পশ্চিম দিক থেকে সূর্যোদয়। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, এই নিদর্শন প্রকাশিত হওয়ার আগে পর্যন্ত তওবার সুযোগ থাকবে। কিন্তু পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উঠলে মানুষের ঈমান গ্রহণ ও তওবার সুযোগ বন্ধ হয়ে যাবে।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যেদিন তোমার রবের কোনো নিদর্শন এসে পড়বে, সেদিন কোনো ব্যক্তির ইমান তার কাজে আসবে না, যদি সে আগে ইমান না এনে থাকে অথবা তার ইমানের মাধ্যমে কোনো কল্যাণ অর্জন না করে থাকে।’ (সুরা আনআম, আয়াত : ১৫৮)
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত হওয়ার আগে তওবা করবে, আল্লাহ তার তওবা কবুল করবেন।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৭০৩)
৩. মানুষের অধিকার নষ্ট করলে
ইসলামে আল্লাহর হক এবং মানুষের হক—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। নামাজ-রোজার মতো আল্লাহর হকসংক্রান্ত কোনো অপরাধ আল্লাহ চাইলে ক্ষমা করতে পারেন। কিন্তু কারও সম্পদ আত্মসাৎ, সম্মানহানি কিংবা অন্য কোনোভাবে মানুষের অধিকার নষ্ট করলে শুধু আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়াই যথেষ্ট নয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া বা তার কাছ থেকে ক্ষমা চাওয়াও জরুরি।
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের সম্মান নষ্ট করেছে বা কোনো জুলুম করেছে, সে যেন আজই তার কাছ থেকে তা মাফ করিয়ে নেয়...।’ (বুখারি, হাদিস : ২৪৪৯)
ইমাম নববি তার ‘রিয়াদুস সালিহিন’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন করার ক্ষেত্রে তওবার জন্য সেই অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে ক্ষমা চাওয়া প্রয়োজন। (রিয়াদুস সালিহিন, ১/১৪, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯৫)
৪. শিরক বা কুফরের ওপর মৃত্যুবরণ করলে
ইসলামে শিরককে সবচেয়ে গুরুতর পাপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে জীবিত অবস্থায় শিরক বা কুফর থেকে আন্তরিকভাবে তওবা করে ঈমান গ্রহণ করলে আল্লাহ ক্ষমা করতে পারেন। কিন্তু কেউ যদি শিরক বা কুফরের ওপর অটল থেকে মৃত্যুবরণ করে, তার জন্য পরকালে ক্ষমা পাওয়ার সুযোগ থাকবে না।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সঙ্গে শরিক করার অপরাধ ক্ষমা করেন না। এ ছাড়া অন্যান্য অপরাধ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ৪৮)
এ আয়াতের আলোকে বোঝা যায়, শিরক থেকে ফিরে এসে তওবা করার সুযোগ জীবিত অবস্থায় রয়েছে। তাই পাপের ওপর অটল না থেকে আল্লাহর কাছে ফিরে আসাই মুমিনের কর্তব্য।
তওবা শুধু মুখের কথা নয়
তওবা মানে শুধু মুখে ক্ষমা চাওয়া নয়; এর জন্য পাপ থেকে ফিরে আসা, অনুতপ্ত হওয়া এবং পুনরায় সেই পাপে না ফেরার আন্তরিক সংকল্প থাকা জরুরি। আর অন্যের অধিকার নষ্ট করে থাকলে তা যথাসম্ভব ফিরিয়ে দিতে হবে বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।
জীবন ও সুস্থতা থাকতে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং নিজেকে সংশোধন করাই বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ, মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলে কিংবা কেয়ামতের বড় নিদর্শন প্রকাশিত হলে অনুশোচনা আর আগের মতো কাজে আসবে না।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মনিরা রওনক বুবলি
ই-মেইল: kolom24news@gmail.com