মো. নূর নবী শেখ
প্রধানমন্ত্রীর আশপাশের লোকজনের পকেটে সব সময় ফিরতি ফ্লাইটের টিকিট থাকে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর আশপাশে যে লোকগুলো আছে, হয় তারা দ্বৈত নাগরিক, তাদের বিদেশের ভিসা রয়েছে, অথবা তাদের ফিরতি ফ্লাইটের টিকিট পকেটে সবসময় থাকে। প্রধানমন্ত্রীর আশপাশে যে লোকগুলো আছে, আগে আপনারা তাদের দেখেননি, ভবিষ্যতেও আপনারা দেখবেন না। কোনো একটা সংকট আসুক, তাদের এই ফিরতি ফ্লাইটের টিকিটে করে তারা আবার আগের জায়গায় চলে যাবেন।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বিকেলে মোহাম্মদপুরে এক সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আশপাশে লন্ডন থেকে কিছু মানুষ এসে যুক্ত হয়েছেন। এই লন্ডন থেকে যে মানুষগুলো যুক্ত হয়েছেন, তারা নিজেরাও জানেন, নিজেরাও বিশ্বাস করেন যে, দুই বছরের বেশি থাকতে পারবেন না। যেহেতু দুই বছরের বেশি থাকতে পারবেন না, এটা তাদের বিশ্বাস।
‘যারা তাদের ভোট দিয়েছেন, ময়মনসিংহের মেয়েটার মতো, তাদের বিশ্বাস কিন্তু পাঁচ বছরেরই ছিল। এখন যখন ভুলটা বুঝতে পেরেছে, উপলব্ধি হয়েছে, এই কারণে নিজের গায়ে নিজে জুতা মারে। নিজের আঙুলে নিজের গালে নিজে জুতা মারছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর আশপাশে যে লোকগুলো আছে, তারা তো আর পাবলিকের সামনে জুতা মারতে পারবে না। সেজন্য তারা দেখা যাচ্ছে, যতটা সম্ভব লুটেপুটে আবার বিদেশে যাওয়ার বন্দোবস্ত করছে।’
তিনি বলেন, সন্ত্রাসীরা মন্ত্রী হয়েছেন, নাকি মন্ত্রীরা সন্ত্রাসী হয়েছেন? দুইটা হতে পারে। দেশের যে সন্ত্রাসীরা আছে, তাদের মন্ত্রিসভায় নিয়ে আসা হয়েছে। অথবা বর্তমান মন্ত্রীদের উপলব্ধি হয়েছে, বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলার অবনতি এমন পর্যায়ে হয়েছে যে, নিজের নিরাপত্তার জন্য পুলিশ তো আর নিরাপত্তা দেবে না। সুতরাং নিজের জান বাঁচানোর জন্য এবার অস্ত্র নিয়ে মাঠে নামা উচিত।
হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, নিরাপত্তার জন্য একজন প্রতিমন্ত্রী যেখানে অস্ত্র নিয়ে মাঠে নামতে হয়। আপনার সমস্যাটার গভীরে গিয়ে দেখা উচিত। তার মানে দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কাজ করছে না। যদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কাজ করত, তাহলে প্রতিমন্ত্রীকে অস্ত্র নিয়ে মাঠে নামতে হতো না। সরকারের যার দায়, তাকে এই সরকার জবাবদিহির মধ্যে নিয়ে আসে না। সরকার একে-ওকে জবাবদিহির মধ্যে দিয়ে আমাদের চোখে ধুলা দিয়ে, আইওয়াশ করার চেষ্টা করে।
তিনি বলেন, সরকারের মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সর্বপ্রথম পদত্যাগ করানো উচিত। তাকে পদত্যাগ করানো উচিত নানাবিধ কারণে। এক নম্বর কারণ, মিথ্যা কথা বলার কারণে। উনি ইতোমধ্যেই সাংবিধানিক যে শপথ, সেই শপথ মিথ্যা কথা বলে ভঙ্গ করেছেন। এরপর উনি নিজের মন্ত্রণালয়ের কাজ না করে, উনাকে মূলত আমাদের কাছে মনে হচ্ছে, বাংলাদেশে অন্য একটা এজেন্ডা দিয়ে এই দেশে ইনস্টল করা হয়েছে।
“বিএনপির ইতিহাস দেখেন, বিএনপির ইতিহাসে কখনোই শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের কোনো ইতিহাস নেই। আওয়ামী লীগ চুরি করে সফল হয়েছে, আর বিএনপি চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছে। এতটুকুই পার্থক্য।”
বিএনপির নির্যাতন-নিপীড়নের ইতিহাস প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আজকে বিএনপি যেদিকে বাংলাদেশকে নিয়ে যাচ্ছে, এদিকে যদি বাংলাদেশ যেতে থাকে, তাহলে এক-এগারো কেন হলো, এটাও মানুষের সামনে ধীরে ধীরে আসবে। বিএনপিকে যেভাবে পাক-পবিত্র হিসেবে, মজলুম হিসেবে মানুষের সামনে উপস্থাপন করা হয়, কিন্তু এক-এগারোর পেছনে তাদের কতটা দায় রয়েছে, হাওয়া ভবনের দায় রয়েছে, দুর্নীতির কতটা দায় রয়েছে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে বানচাল করার ক্ষেত্রে তাদের যে দায় রয়েছে, এই দায়টাকেও আপনাদের প্রশ্ন করা উচিত।
১৯৯৬ সালের নির্বাচন প্রসঙ্গে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ১৯৯৬ সালে একটা একচ্ছত্র এবং নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়াকে বিএনপি প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ফলশ্রুতিতে আবার নির্বাচন দিতে হয়েছে। ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে তত্ত্বাবধায়ক বিচারপতিদের বয়স বাড়িয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে আবার প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। আপনাদের বিএনপিকে এই প্রশ্নগুলো করতে হবে। তাদের যেভাবে পাক-পবিত্র হিসেবে মানুষের সামনে উপস্থাপন করা হয়, তাদের অতীত ইতিহাস মানুষের সামনে আবার তুলে ধরতে হবে।
'অনেকে বলেন, বিএনপির সবাই চাঁদাবাজি করেন না। এটা সত্য, বিএনপির সবাই চাঁদাবাজি করেন না। কিন্তু যারা চাঁদাবাজি করেন, তারা প্রত্যেকেই বিএনপির। আমরা বলিনি, বিএনপির সবাই চাঁদাবাজি করছেন। কিন্তু যারা চাঁদাবাজি করছেন, তারা প্রত্যেকেই বিএনপির। যারা টেন্ডারবাজি করেন, বিএনপির সবাই কিন্তু টেন্ডারবাজি করেন না। কিন্তু যারা টেন্ডারবাজি করেন, অফিসগুলোকে দলীয়করণ করছেন, তারা প্রত্যেকেই কিন্তু বিএনপির।"
হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, প্রধানমন্ত্রী সবসময় কুমড়ার ভর্তা খান, সবজি খান। উনি রাতে ঘুমান না। উনি দুই ঘণ্টা, তিন ঘণ্টা ঘুমান। আমরা বিরোধী দলের রাজনীতি করি, কিন্তু আপনার প্রতি আমাদের একটা মায়া আছে। সত্য হলো, আপনি বেগম জিয়ার সন্তান। আপনাদের প্রতি আমাদের একটা আন্তরিকতা আছে। আপনি পুষ্টিহীনতায় ভুগছেন। আপনি যেহেতু নিয়মিত ঘুমান না, আপনার সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় এই কারণে সবগুলো ভুল হয়।
"আমরা আপনার ভালো চাই। কিন্তু আপনার আশপাশে বেতনভুক্ত যে চামচা আছে, যারা আপনি কুমড়ার ভর্তা খান বলে, নিয়মিত সবজি খান বলে, রাতে ঘুমান না বলে এগুলোকে সেলিব্রেট করেন। আপনি জাপানে গিয়েছেন, শুনলাম সেখানেও নাকি না ঘুমিয়ে পড়ে আবার মিটিংয়ে চলে গিয়েছেন।"
তিনি বলেন, একটা মানুষ যদি নিয়মিত না ঘুমায়, একটা মানুষ যদি শুধু কুমড়ার ভর্তা খায়, এই লোকটা কি কোনোভাবে একটা সঠিক সিদ্ধান্ত, পুষ্টিকর-সমৃদ্ধ একটা জীবনযাপন করতে পারবেন? এটা কি কোনোভাবেই সম্ভব? একটা মানুষ যদি নিয়মিত পর্যাপ্ত না ঘুমায়, তার পক্ষে কি কোনো সূক্ষ্ম চিন্তা করা সম্ভব, যৌক্তিক চিন্তা করা সম্ভব? আপনাকে এই ধরনের একটা অস্বাস্থ্যকর জীবনে ব্যস্ত রেখে সালাহউদ্দিনরা লুটপাটে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন, আর সেটা আপনি দেখতে পাচ্ছেন না। আপনাকে ব্যস্ত রাখা হয়েছে। কিন্তু আপনার পক্ষ আমরা বলতে পারব না। এই কারণে বলতে পারব না, তখন আমাদেরকে বলবে সবাই খারাপ, কিন্তু উনাকে ভুল বোঝানো হয়েছে। এটা পূর্বের প্যাটার্নের সঙ্গে আবার পরিচিত লাগছে।
তিনি আরে বলেন, আপনার আশপাশের এই চোর, দুর্নীতির দায়ে সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সরিয়ে দিন। আপনারা জানেন, বাংলাদেশের বর্তমান যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আছেন, উনিও কিন্তু দুর্নীতির দায়ে সাজাপ্রাপ্ত। উনার দুর্নীতির দায়ে ১৩ বছরের জেল হয়েছে। উনার বিরুদ্ধে কী কী অভিযোগ ছিল? এক কোটি টাকা ঘুষের অভিযোগ ছিল এবং সেটা প্রমাণিত হয়েছে। উনার বিরুদ্ধে ঘের দখলের অভিযোগ ছিল, উনার বিরুদ্ধে টেন্ডারবাজির অভিযোগ ছিল। আপনার একজন প্রমাণিত সাজাপ্রাপ্ত লোককে আপনি পুতঃপবিত্র বানিয়ে আবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়েছেন।
“আমরা এই সাজাপ্রাপ্ত, দুর্নীতির দায়ে সাজাপ্রাপ্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দেখতে পাচ্ছি, আবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে নিয়ে এক ধরনের ছলনা শুরু করে দিয়েছেন।”
হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, সালাহউদ্দিন আহমদ, নিজেকে এত চালাক ভাবার দরকার নেই। রাস্তার মধ্যে আপনি একা বের হতেও পারবেন না। আপনার নিজের দলের মানুষই কিছুদিন পরে বিচার করবেন। আমাদের বিচার করা লাগবে না। বিএনপির দীর্ঘদিনের নির্যাতিত-নিপীড়িত যারা বাসায় আসতে পারেননি, যারা আওয়ামী লীগের অত্যাচারে ধানখেতে ঘুমাতে হয়েছে, যারা সন্তানের সঙ্গে থাকতে পারেননি, যারা বাসায় এক রাত নির্বিঘ্নে ঘুমাতে পারেননি, সেই নির্যাতিত-নিপীড়িত বিএনপির প্রত্যেকেই বোঝেন, আজকের এই বিএনপির জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার পেছনে সালাহউদ্দিনের একক ভূমিকা রয়েছে।
মোহাম্মদপুরবাসীর উদ্দেশে তিনি বলেন, এই মোহাম্মদপুর নাগরিক সমস্যা-জর্জরিত একটা এলাকা। আমরা চাই, এই নাগরিক সমস্যাগুলো সমাধান করতে। আপনারা যারা রয়েছেন, ব্যবসায়ীরা রয়েছেন, আপনারা এখানে দূর থেকে দেখছেন। আমরা জানি, আপনারা ভয়ে কথা বলেন না। ভয়ে কথা বলার দরকার নেই। কারণ, মজলুম যখন নিশ্চুপ থাকে, মজলুম যখন নিচ থেকে একটা ‘উহ্’ উচ্চারণ করে, সেটাই জালিমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে লিখিত হতে থাকে।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মনিরা রওনক বুবলি
ই-মেইল: kolom24news@gmail.com